খুলনা, বাংলাদেশ | ২৬শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ১০ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Breaking News

  ‎ডুমুরিয়ায় তিন বিলের পানি নিষ্কাশনে স্লুইস গেটের পলি অপসারণ স্বেচ্ছাশ্রমে
  কর্ণফুলী নদী থেকে অজ্ঞাত তরুণীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার
  মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে তরুণদের হাতে ফুটবল বিতরণ করলেন যুবনেতা শেখ হুমায়ূন কবির
  লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি সফল করতে নিরাপদ খুলনা চাই-এর প্রস্তুতি সভা
  অসুস্থ মায়ের সুস্থতা কামনায় সবার কাছে দোয়া চাইলেন উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব সোহাগ
  ডুমুরিয়া সদর ইউনিয়নের উন্নয়নের প্রত্যয়ে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মোল্লা আবরার হোসেন সৈকতের দোয়া ও সমর্থন কামনা
  ১১ বছরের পথচলায় খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: উৎসবের সঙ্গে নতুন স্বপ্নের অঙ্গীকার
  খর্নিয়া ইউপি নির্বাচন ঘিরে সরগরম রাজনৈতিক অঙ্গন, তৃণমূলের আলোচনায় বিএনপি নেতা শেখ শাহিনুর রহমান
  দাকোপে ৩ দিনের ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত জনজীবন।
  ডুমুরিয়ার খর্নিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় বি এনপি নেতা আবুল কাশেম

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন: বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা ও ‘টিআরএম’ বাস্তবায়নের তাগিদ

[ccfic]

শেখ মাহতাব হোসেন (ডুমুরিয়া, খুলনা)

খুলনা জেলার ডুমুরিয়া-ফুলতলা এবং যশোরের মণিরামপুর, অভয়নগর ও কেশবপুর—এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জন্য ‘জলাবদ্ধতা’ আর কোনো সাময়িক বা মৌসুমি দুর্যোগ নয়; বরং এটি দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চেপে বসা এক স্থায়ী অভিশাপ। স্থানীয় জলবায়ু ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় ভবদহ স্লুইসগেট আজ দীর্ঘস্থায়ী এই মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকটের এক চরম প্রতীকে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ভবদহ ও সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ সরাসরি এই পলিজনিত কৃত্রিম জলাবদ্ধতায় বন্দি হয়ে জীবনযাপন করছেন।সম্প্রতি এই সংকট নিরসনে একটি সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ও বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনায় জলাবদ্ধতার মূল কারণ, অতীতের সীমাবদ্ধতা এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের উপায় উঠে এসেছে।বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিল ‘বিল ডাকাতিয়া’সহ ভবদহ অঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমি বছরের সিংহভাগ সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকে। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী, হরি, ভদ্রা ও শালতা নদীর তলদেশ পলি জমে উঁচু হয়ে যাওয়ায় বিল থেকে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ।এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে অঞ্চলটির সামগ্রিক কাঠামোর ওপর:অর্থনৈতিক বিপর্যয়: ফসল, মাছের ঘের ও সবজি চাষ বিনষ্ট হয়ে ধসে পড়েছে স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতি।অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি: রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, হাটবাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর প্লাবিত থাকছে।স্বাস্থ্য ও সুপেয় পানির সংকট: স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এবং নিরাপদ পানির উৎসে দূষণ ঘটায় পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।সামাজিক অস্তিত্বের ঝুঁকি: প্রায় ২০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি।মূল কারণ বিশ্লেষণ:পোল্ডার ব্যবস্থার অনভিপ্রেত ফল ১৯৬০-এর দশকে জোয়ার-ভাটা ও বন্যা থেকে সুরক্ষার জন্য নির্মিত পোল্ডার (বাঁধ-ঘেরা এলাকা) ব্যবস্থার কারণে জোয়ারের পলি প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। ফলে পলি সরাসরি নদীখাতে জমে নদীগুলোকে ভরাট করে ফেলেছে।পলি প্রবাহ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো:উজান থেকে মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস, অবৈধ নদী দখল, নদীর চরে ইটের ভাটা স্থাপন এবং বিলে অননুমোদিত নেট-পাটা দিয়ে মাছ চাষ নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাসের প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করেছে।পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বিভিন্ন সময়ে নেওয়া স্বল্পমেয়াদী খনন ও রেগুলেটর নির্মাণ প্রকল্পগুলো সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার অভাবে স্থায়ী ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সমাধান হিসেবে ‘TRM’: সম্ভাবনা ও আস্থার সংকট স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতালব্ধ উদ্ভাবন টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (TRM) বা জোয়ারাধার পদ্ধতি হলো কারিগরিভাবে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। এতে সাময়িকভাবে পোল্ডারের বাঁধ কেটে জোয়ারের পলিযুক্ত পানি বিলে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়, ফলে পলিতে বিল উঁচু হয় এবং নদী খাত পলি মুক্ত হয়ে নাব্য থাকে।আস্থার সংকট প্রধান বাধা:বিল ভায়না ও সাতক্ষীরার পাখিমারা বিলে TRM-এর সাফল্য থাকলেও সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এতে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের সময়মতো ও স্বচ্ছভাবে ক্ষতিপূরণ না দেওয়া এবং বৈজ্ঞানিক মডেলিং মেনে সমন্বিতভাবে কাজ না করায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।সাম্প্রতিক অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা+সম্ভাব্যতা সমীক্ষা: দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (IWM)-কে সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়।সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে খনন: ভবদহ ও সংলগ্ন ৫টি নদীর ৮১.৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননে সেনাবাহিনী তদারকি করছে।বাস্তবায়নে ধীরগতি: টেকসই TRM সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে সম্প্রতি স্থানীয় সংগঠনগুলো দ্রুত কার্যকরের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি প্রদান করেছে।সমন্বিত সমাধান-কাঠামো ও সুপারিশ :দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই অভিশাপ দূর করতে একটি ত্রি-মুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:চলমান ৮১.৫ কিমি নদী পুনঃখনন কাজ দ্রত শেষ করা।তীব্র প্লাবিত বিলগুলোতে পাম্পের মাধ্যমে সেচ ও তাৎক্ষণিক ত্রাণ নিশ্চিত করা।খাল-নদীর অবৈধ দখল ও অননুমোদিত মাছের ঘের বা নেট-পাটা উচ্ছেদ করা মধ্যমেয়াদী পদক্ষেপ:WM-এর সমীক্ষা অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক মডেলিং মেনে ধাপে ধাপে বিলে TRM চালু করা ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিমালিকদের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত স্বচ্ছ ও দ্রুত ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন স্থানীয় পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি ও কৃষকদের প্রকল্প পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা।দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ : ভবদহ-বিল ডাকাতিয়া অববাহিকার জন্য স্থায়ী ‘সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন।পাউবো, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী কমিটি গঠন, যাতে সরকার পরিবর্তনের সাথে প্রকল্প থমকে না যায়।রিমোট সেন্সিং (GIS) ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে নিয়মিত পলি জমার হার ও নাব্যতা পর্যবেক্ষণ।উপসংহার: ভবদহ ও সংলগ্ন বিল এলাকার জলাবদ্ধতা কোনো একদিনের সমস্যা নয়। কেবল সাময়িক নদী খনন বা ত্রাণ বিতরণ করে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রযুক্তিগতভাবে প্রমাণিত ‘টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট’ (TRM) বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনই পারে এই অঞ্চলের কোটি মানুষকে স্থায়ী মুক্ত দিতে।

আরও সংবাদ

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

©2025 khulnarsamayerkhobor .com

Developed By: ShimantoIT